শহরের নামকরা ব্যবসায়ী অচিন্ত্যশেখর দাশের বাড়িতে অনেকদিন থেকেই কেয়ারটেকারের চাকরিটা করে আসছে রজত। বছর ত্রিশেকের অবিবাহিত যুবক রজত।
একা মানুষ অচিন্ত্যবাবু । স্ত্রী এবং একমাত্র সন্তানকে মোটর দুর্ঘটনায় একত্রে হারিয়েছেন তিনি। সেটাও আজ অনেকবছর হলো। সবেধন নীলমনি, দাদুর চোখের মনি একমাত্র নাতনীটিও উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে আছে।
রজতই বাড়ির সবকিছু দেখে শুনে রাখে।

মানুষ হিসেবে অচিন্ত্যশেখরের কাছে রজত বেশ পছন্দের। শুধু একটাই সমস্যা মনে হয় তাঁর কাছে সেটা হলো, কাজকর্ম থেকে একটুখানি ফাঁক পেলেই যখন- তখন বাঁশি বাজাতে বসে পড়ে ছেলেটা। আর তখন এমন বিভোর হয়ে থাকে সে, কানের কাছে ড্রাম বাজালেও ঘোর ভাঙেনা তার!
যেন এই দুনিয়াতেই থাকেনা তখন সে।
এতে কাজকর্মের কিছুটা ব্যাঘাত ঘটলেও ছেলেটার প্রতি অসীম মায়া অচিন্ত্যশেখরের! তাকে ছেড়ে দেয়ার কথা তাই চিন্তাতেও আনতে পারেন না তিনি!

অচিন্ত্যবাবুর নয়নের মনি নাতনিটা তিনবছর পর দেশে ফিরছে আগামী সপ্তাহে। সেই উপলক্ষে বাড়িতে সাজসাজ রব ফেলে দিয়েছেন দাদু অচিন্ত্যশেখর। কাজের লোক, ড্রাইভার, মালী সবাইকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখছেন একেবারে! রজতকে শহরে পাঠিয়েছেন বিভিন্ন রান্নার সরঞ্জাম, মশলা, রেডিমেড খাবার, ঘর সাজানোর জন্য শো পিস ইত্যাদি সংগ্রহের জন্য। গাড়ি বোঝাই করে সব নিয়ে এসেছে রজত সাথে নিজের জন্য একটা বাঁশিও।
রূপোবাঁধানো এই বাঁশিটি রজত পেয়েছে হোমডেকরের এক দোকানে। ঘর সাজানোর জিনিষের দোকানে পাওয়া এই এন্টিক বাঁশিটা কিন্তু চমৎকার সুর তোলে! তাই তো বাঁশিটা কিনতে নিজের জমানো অর্থের অনেকটা খরচ হয়ে গেলেও এতটুকু দ্বিধা করেনি সে।
সওদাপাতি সব নিয়ে রজত যখন বাড়িতে ফিরলো তখন বেশ রাত হয়ে গেছে।
জায়গামতো সবকিছু রেখে নিজের ঘরে বসে সে যখন সদ্য কেনা বাঁশিটাতে সুর তুললো অমনি বিস্মরণের এক খেয়া তাকে যেন কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে গেলো!
দুলে দুলে ভেসে চলে রজত!

পাটলিপুত্রের রাজপথ জুড়ে এখন তুমুল ব্যস্ততা! সর্বত্র সাজ সাজ রব! দশেরার উৎসবে আজ মহারাজ নিজে আসবেন। বিশাল খোলা প্রাঙ্গণে রাবণের কুশপুত্তলি সাজানো আছে। খোদ মহারাজ তাতে আগুন দেবেন। মনোহারী দোকান, মিষ্টান্নের দোকান সবখানেই উপচে পড়া ভিড়।
এই ভীড়ের মাঝে করুণ মুখে বাঁশি হাতে হেঁটে চলেছে পিতৃমাতৃহীন কিশোর দ্রুপদ। বাঁশিওয়ালা সে।
এত আনন্দের মাঝে আজ আর কেউ তার বাঁশি শুনতে চাইবে না। নিশ্চিতভাবেই অভুক্ত থাকতে হবে তাকে আজও ।
অনতিদূরে শোন নদীর তীরে বসে দু’চোখ মুদে বাঁশিতে সুর তুলে দ্রুপদ। বড্ড করুণ সেই সুর যেন গলে গলে দ্রুপদের দু’চোখ বেয়ে নেমে আসছে। ক্ষুধার জ্বালা যে বড় সর্বনেশে!
বাঁশি শেষে চোখ মেলতেই অবাক দ্রুপদ দেখে, তার সামনে রাজবেশে এক সৌম্যকান্তি পুরুষ দাঁড়িয়ে।
জানতে পারলো সেই পুরুষ পাটলিপুত্রের কনিষ্ঠ যুবরাজ।
জনশ্রুতি আছে এই যুবরাজ রাজদরবার, রাজনীতি, যুদ্ধ- কোলাহল ইত্যাদি থেকে দূরে থাকে সবসময়। শিল্প সাহিত্যের বড় সমঝদার তিনি।
দ্রুপদকে নিজের সঙ্গে রাজবাড়িতে নিয়ে গেলেন যুবরাজ।

বেশ কিছুদিন ধরে রাজকুমারী যোজনগন্ধা অন্দরমহল থেকে মনকাড়া এক বাঁশির সুর শুনছে। এই সুরের উৎস জানতে গিয়ে খাস দাসীর কাছ থেকে দ্রুপদের কথা জেনে দ্রুপদকে তার সামনে পেশ করার হুকুম দেয় রাজকুমারী।

বাঁশিকে কেন্দ্র করেই দুই সমবয়সী কিশোর- কিশোরীর মাঝে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। সেই বন্ধুত্বের সূত্র ধরেই দ্রুপদের এখন অবাধ যাতায়াত অন্দরমহলে। রাণীরাও দ্রুপদের বাঁশি শুনতে বেশ ভালোবাসেন।
কিন্তু রাজবাড়িতে কুড়িয়ে পাওয়া কিশোর দ্রুপদের এহেন উত্থান অনেকেই ভালো চোখে দেখেনি। হিংসার বশবর্তী হয়ে সত্যি- মিথ্যা মিশিয়ে রাজমুমারদের কানভারী করতে তাই বেশি সময়ও নেয়নি তারা।

” দ্রুপদ, আজ তোমার জন্য এক পরম উপহার এনেছি আমি। “যোজনগন্ধা যেন আজ একটু বেশিই উজ্জ্বল!
” কি এনেছো? ”
” এই রূপোবাঁধানো বাঁশিটি আমি শুধু তোমার জন্য তৈরি করিয়েছি। নাও, হাতে নিয়ে এমন একটা মোহন সুর তুলো যাতে সবাই মোহিত হিয়ে যায়। ”

” বাহ! কি অপূর্ব দেখতে! আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার”! স্মিত হেসে উত্তর দেয় দ্রুপদ।

দ্রুপদের কথা শেষ হতে না হতেই অতর্কিতে কিছু সিপাহি ঝাঁপিয়ে পড়লো দ্রুপদের উপর। হাত- পা বেঁধে ফেলা হলো তার।
যোজনগন্ধাকেও জোর করে ধরে রাখা হলো।
বড় রাজপুত্রের নির্দেশে চলে এলো অম্লযান। দ্রুপদের গলায় ঢালা হবে সেটা।
যোজনগন্ধা আপ্রাণ চেষ্টা করছে তাকে বাঁচানোর। পাত্রের অম্লরাজ প্রথমে পড়লো যোজনগন্ধার হাতে, তারপর দ্রুপদের কন্ঠে। পরে ছিটিয়ে দেয়া হলো তার সারা শরীরে।
যোজনগন্ধার কোমল হাতের তালুটা পুড়ে নিমেষে কালো হয়ে গেলো।
বাঁচাও!
প্রবল চিৎকারে রজতের ঘুম ভেঙে গেলো।

অচিন্ত্যশেখরের নাতনি এসেছে কাল। সাথে তিন মেমসাহেব বান্ধবী।
রজত তাদের দেখার জন্য বেশ কয়েকবার উঁকিঝুঁকি মেরেছে কিন্তু একবারও ভাগ্যলক্ষী সুপ্রসন্ন হয়নি তার।

রজতের রূপোর বাঁশিতে আজ যেন সেই দু:স্বপ্নের সুরটাই বাজছে আবার। নিজের অজান্তে হাতের আঙুল গুলো চলছে তার।
দরজার পাশে ওটা কে দাঁড়িয়ে? কে?
কে ওখানে?
” আপনি খুব ভালো বাঁশি বাজান তো! আমি যোজনগন্ধা দাশ। দাদুর নাতনি। ” বলে মেয়েটি হাত বাড়িয়ে দিলো রজতের দিকে।

একি! এযে তার স্বপ্নে দেখা সেই রাজকুমারীটিই? হুবহ একই রকম দেখতে.. …..
রজত যেন ঘোরের মধ্যেই রয়েছে এখনো!
“আপনার হাতে পোড়া দাগটা কিসের? মানে কেন? ”
প্রথম কথাতেই অভব্যের মতো প্রশ্নটা করে ফেলে রজত।
” ওটা? ওতো আমার জন্মদাগ। মনে হয় আগের জন্মের কিছু হবে “! কৌতুকমিশ্রিত উত্তর যোজনগন্ধার।